কমিউনিটি ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

টাওয়ার হ্যামলেটসে ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে চালু হলো ফ্রি কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস ক্লাস

বাংলাসহ ৪টি ভাষায় সপ্তাহে ২২টি ক্লাস চলছে

post

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের উদ্যোগে আবারো চালু হয়েছে ইয়াং কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস (ওয়াইসিএল) সার্ভিস। এর মাধ্যমে এই বারাতে কমিউনিটি ভাষা শিক্ষালাভের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

বহুজাতিক ও বহুভাষী মানুষের বাসস্থান টাওয়ার হ্যামলেটসের কমিউনিটিতে পারস্পরিক ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের বন্ধন আরও শক্ত করতে বর্তমানে আটটি কেন্দ্রে বাংলা, আরবি, ক্যান্টনিজ, ম্যান্ডারিন ও সোমালি ভাষার ফ্রি ক্লাসে অংশ নিচ্ছে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রায় ৩০০ শিশু-কিশোর। আর প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে চারটি ভাষায় প্রতি সপ্তাহে মোট ২২টি ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

স্কুল সময়ের বাইরে ও সপ্তাহান্তে (শনি-রবিবার) পরিচালিত এই ক্লাসগুলো টাওয়ার হ্যামলেটসের বহুসাংস্কৃতিক কমিউনিটিগুলোর বাস্তব চাহিদাকে সামনে রেখে গড়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন আইডিয়া স্টোর, স্কুল, লাইব্রেরি ও কমিউনিটি সেন্টারে পরিচালিত এই উদ্যোগ শিশুদের শুধু ভাষা শেখার সুযোগই করে দিচ্ছে না, বরং তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সহায়তা করছে।

কমিউনিটির বাড়তি আগ্রহ এবং এতে অংশগ্রহণের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে আরও স্কুল ও কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানে এই ভাষা শিক্ষা ক্লাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সাল থেকে জিসিএসই ও এ-লেভেল পর্যায়ের বাংলা ও অন্যান্য কমিউনিটি ভাষা শিক্ষাদান অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা তাদের পরীক্ষার বিষয় হিশেবে এসব ভাষায় জিসিএসই ও এ-লেভেল পরীক্ষা দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে টাওয়ার হ্যামলেটসের এক্সিকিউটিভ মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, "বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, যেসব শিশু বহুভাষিক, যারা মাতৃভাষায় দক্ষ, নিজের ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন এবং একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারে, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এসব শিশু পড়াশোনায় ভালো ফল করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনে অপেক্ষাকৃত বেশি সফল হয়।"

"এই ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাউন্সিল প্রায় ১ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করেছে" উল্লেখ করে মেয়র বলেন, "আমাদের লক্ষ্য হলো- আমাদের শিশুরা যেন বহুভাষিক হয়ে ওঠে। তারা শুধু ইংরেজিতেই নয়, নিজেদের কমিউনিটির ভাষা এবং অন্যান্য ভাষাতেও সাবলীলভাবে যেনো কথা বুঝতে, বলতে, পড়তে ও লিখতে পারে।"

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "অনুগ্রহ করে এই সুযোগগুলো কাজে লাগান। আপনার সন্তান যদি দুই বা তিনটি ভাষায় মনের ভাব আদান-প্রদান করতে পারে তাহলে সে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আরও বেশী সক্ষমতা নিয়ে বড় হবে। ইংরেজি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মাতৃভাষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অন্য ভাষা শিখতে পারলে তা আপনার সন্তানকে আরও আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আরো ভালোভাবে প্রস্তুত করে তুলবে।"

বিনামূল্যে ভাষা শিক্ষার এই সুযোগ টাওয়ার হ্যামলেটসে বসবাসকারী, এই বারার স্কুলের শিক্ষার্থী এবং যাদের বাবা-মা বা অভিভাবক টাওয়ার হ্যামলেটসে কাজ করেন তাদের সকলের জন্যই উন্মুক্ত। এর ফলে বহু পরিবার সহজেই এই কর্মসূচির সুফল গ্রহণ করতে পারছে।

প্রাইমারী স্কুল শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য ইয়াং কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস বিশেষ সার্টিফিকেট প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যাতে শিশুদের ভাষাশিক্ষা সাফল্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া যায় এবং তারা মাধ্যমিক পর্যায়ে ভাষা শিক্ষা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হয়।

এছাড়া ২০২৬ সালের মে মাস থেকে জিসিএসই ও এ-লেভেল পর্যায়েও ভাষা শিক্ষার কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা ২০২৭ সালের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে।

এই সার্ভিস সম্পর্কে এডুকেশন বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার, এবং ডেপুটি মেয়র, কাউন্সিলার মাইয়ুম তালুকদার বলেন, "বহু বছর আগে বাজেট কাটছাঁটের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস আবার চালু হওয়ায় কিশোর-তরুণ বয়সীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমি নিজেই তার একটি উদাহরণ। আমি জর্জ গ্রিনস স্কুলে বাংলা পড়াশোনা করেছি এবং ভালো ফল অর্জন করেছি।"

তিনি আরও বলেন, "কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ মানুষকে একত্র করে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। একই সঙ্গে এটি আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। প্রতিটি মানুষের ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ, আর কমিউনিটি ভাষা সেই ঐতিহ্যের সঙ্গেই আমাদের যুক্ত করে।

হোয়াইটচ্যাপেলের আইডিয়া স্টোরে বাংলা শিখতে আসে ছয় বছরের মাইমুনা। ছোট্ট মাইমুনা জানায়, সে বাংলা শিখছে। এখন সে বর্ণমালা অ, আ পড়তে পারে।

তাহমিনা খানম তার দুই সন্তানকে বাংলা শিখতে পাঠান আইডিয়া স্টোরে। তিনি জানান, ছোট বেলায় বাংলাদেশে গিয়ে বাংলা শেখার সুযোগ হয়েছিলো তার। কিন্তু এখানে তিনি তার সন্তানদের বাংলা শিখাতে পারছিলেন না। নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে নিজস্ব ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই তিনি তার সন্তানদের এখানে নিয়ে আসছেন। এখন তার সন্তানরা বাসায় গিয়ে ছোট ছোট শব্দ বলছে বাংলায়। তিনি বলেন, "আমি আশা করছি সামনে তারা সুন্দর করে এই ভাষায় তাদের নানী-দাদীদের সাথে কথা বলতে পারবে।"

চাইনিজ ভাষা শিক্ষক জিয়াংকান ইয়াং জানান, "যখন শিশুরা ক্লাসে প্রবেশ করে চাইনিজ ভাষায় সবাইকে শুভেচ্ছা জানায় তখন শুনতে অন্য রকম লাগে।"


আরো পড়ুন!

Sidebar Banner
Sidebar Banner