বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একসময় জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রধান কারণ হলো—১৯৯১ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কটি জাতীয় নির্বাচন জনগণের কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে, তার সবকটিই অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।
দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে একই বছরের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এর ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং বিষয়টি আবারও আদালতের বিবেচনায় আসে। সেই ধারাবাহিকতায় সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একটি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেছে।
গত ১৫ মার্চ রোববার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ৭৪ পৃষ্ঠার ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে এর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু একই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আগের মতো সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের যে বিধান পুনরুল্লেখ করা হয়েছে, সেটিই এখন নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
কারণ বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই বিধানকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক, সন্দেহ ও কৌশলগত টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে বারবার এমন অভিযোগ উঠেছে যে, কে হবেন “সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি”—তা নিয়েও নানা কৌশল, পদক্ষেপ ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হয়েছে। এর ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিচার বিভাগকে টেনে আনা হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্কের অঙ্গনে।
এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
বিচার বিভাগ হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ভরসার জায়গা , যার প্রতি মানুষের আস্থা শেষ আশ্রয় হিসেবে টিকে থাকে। রাজনীতি যখন উত্তপ্ত হয়, যখন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়—তখন জনগণ ন্যায়বিচারের আশায় তাকিয়ে থাকে আদালতের দিকে। সেই বিচার বিভাগকে যদি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের গুটি হিসেবে ব্যবহার করার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য করা। কিন্তু যদি সেই ব্যবস্থার প্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক কৌশলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে, তাহলে তা পুরো ব্যবস্থাকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে এই পদে বসানোর বিধান বাস্তবে বিচার বিভাগের মর্যাদাকে অযথা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এই বাস্তবতায় সময় এসেছে সাহসী ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান বাতিল করা এখন জরুরি। তার পরিবর্তে এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে, যেখানে দেশের সর্বজনস্বীকৃত, নিরপেক্ষ, সৎ ও মর্যাদাবান কোনো নাগরিক—যিনি রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রভাবের বাইরে—তাঁকে এই দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া যায়।
এতে একদিকে যেমন বিচার বিভাগের পবিত্রতা ও মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে, অন্যদিকে নির্বাচনকালীন সরকারও হবে অধিক গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত।
রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের মধ্যে বিচার বিভাগই সবচেয়ে বেশি আস্থার প্রতীক। সেই আস্থাকে রাজনৈতিক কৌশলের বলি হতে দেওয়া যায় না।
তাই আজ সময়ের দাবি—দোহাই আল্লার- বিচার বিভাগকে রাজনীতির বাইরে রাখুন।
লন্ডন : ১৬.০৩.২০২৬
প্রবাসী সাংবাদিক লেখক ও কলামিস্ট শেখ মহিতুর রহমান বাবলুর ভেরিফাইড ফেসবুক থেকে সংগৃহীত







