আন্তর্জাতিক ১৪ আগস্ট ২০২৬

ইরানে হামলার জন্য আসা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হাজারো সেনার জীবন সংকটে

post

টিভি নাইনটিন নিউজ ডেস্ক ( অনলাইন )যুক্তরাষ্ট্র: মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন হাজারো মার্কিন সামরিক সদস্য। দীর্ঘ এই মোতায়েনের মধ্যে খাদ্যসংকট, পানি ও প্লাম্বিং সমস্যা, ডাক সরবরাহে ব্যাঘাত এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।রণতরীটির প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের জীবনযাপন নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগের অনেকগুলোকে ‘ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে দাবি করেছেন।মার্কিন সামরিকবিষয়ক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের এই মোতায়েনে কিছু নাবিক চরম মানসিক চাপে পড়েছেন। এমনকি কয়েকজন জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে একজন নাবিক সাগরে পড়ে গেলে তাকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা এখনো তদন্তাধীন।

কংগ্রেসে প্রশ্ন, পেন্টাগনের কাছে ব্যাখ্যা দাবি

কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দেওয়া এক চিঠিতে রণতরীটিতে ‘মৌলিক সরবরাহের সংকট, দূষিত পানি, প্লাম্বিং ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেক নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ডাক ব্যবস্থার ব্যাঘাতের’ অভিযোগ তুলে ধরেছেন।তার ভাষ্য, এসব প্রতিবেদনকে অবিলম্বে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নৌবাহিনী এত দীর্ঘ সময় ধরে এই মাত্রার অপারেশনাল চাপ কতটা টেকসইভাবে বহন করতে পারছে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগোও পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে তদন্তের জন্য কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদলকে রণতরীটিতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইকেল লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, জাহাজটির কিছু গোসলখানায় ছত্রাক ধরেছে, টয়লেট বিকল রয়েছে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাপড় ধোয়ার সুযোগ পাওয়া যায়নি, দীর্ঘ সময় গরম পানি ছিল না এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রীর ঘাটতিও দেখা দিয়েছে।

‘আমি মৃতপ্রায় ক্লান্ত’

জাহাজে থাকা এক নাবিকের আত্মীয় বিবিসিকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ এই মোতায়েনের পর তার স্বজনের ওজন প্রায় ৬৫ পাউন্ড বা ২৯ কেজি কমে গেছে।তার দাবি, দীর্ঘদিন বন্দরে ভিড়তে না পারা, জাহাজ থেকে নামার সুযোগ না থাকা, সার্বক্ষণিক কম্পন ও শব্দ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং সতেজ খাবারের ঘাটতি নাবিকদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।ওই আত্মীয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্বজন তাকে লিখেছেন, ‘আমি মৃতপ্রায় ক্লান্ত। একেবারে মৃত।তবে মার্কিন নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এসব অভিযোগের বড় অংশ খণ্ডন করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যাচেষ্টার ঘটনা বেড়েছে-এমন তথ্য নৌবাহিনীর কাছে নেই।ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যুদ্ধকালীন তৎপরতার কারণে নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও বর্তমানে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রথমে খাদ্য, এরপর স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং পরে ডাক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, জাহাজে বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টিকর খাবারের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে।হেগসেথের দাবি, নাবিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে গত বৃহস্পতিবার পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, সরকার চেষ্টা করছে যেন ‘প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু ও প্রতিটি ক্যাপ্টেন’ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা পান।কিছু সামরিক মোতায়েন অন্যগুলোর তুলনায় দীর্ঘ হয় উল্লেখ করে তিনি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা নাবিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে তিনি আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের বর্ণনাকে বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেন।ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলসও বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী-দুজনই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

দীর্ঘ হচ্ছে রণতরীর মোতায়েন


ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে রণতরীটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, মে মাসে জাহাজটির যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একাধিক দফায় সেই সময়সীমা বাড়ানো হয়। এরপর রণতরীটির ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করা হয়নি।সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নৌবাহিনীর সদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে অতীতে বিঙ্গো, শিল্পচর্চা ও সংগীত প্রতিযোগিতার মতো বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচিও চালু করা হয়েছিল বলে সামরিক প্রকাশনা স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে।

নৌবাহিনীতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে তীব্র মানসিক সংকটের হার বেশি। সেখানে অনুপযুক্ত আবাসন, একটানা শব্দ, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ চাপের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।মার্কিন নৌবাহিনী ও মেরিন কোরে আত্মহত্যাও দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। সামরিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক প্রকাশনা ইউএসএনআই নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে নৌবাহিনীতে ৬০ জন এবং মেরিন কোরে ৪৬ জন আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যা এখনো নৌবাহিনী ও মেরিন কোরে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে।সব মিলিয়ে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন শুধু সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন নয়, নাবিকদের জীবনযাপন, বিশ্রাম, সরবরাহব্যবস্থা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে। কংগ্রেসে তদন্তের দাবি জোরালো হওয়ায় এখন নজর রয়েছে পেন্টাগন ও নৌবাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।সূত্র: বিবিসি

আরো পড়ুন!

Sidebar Banner
Sidebar Banner