শেখ মহিতুর রহমান বাবলু : প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব আর সময়ের নিরন্তর চাপের মাঝেও কিছু দিন থাকে, যেগুলো মানুষকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলে। এমনই একটি দিন উপহার দিল লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের বার্ষিক সামার ট্রিপ ২০২৬। দেশের বাইরে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সর্ববৃহৎ এই সংগঠনের এবারের ভ্রমণ গন্তব্য ছিল ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক সমুদ্র শহর হেস্টিংস সি সাইড।
সকালের প্রাণবন্ত পরিবেশে লন্ডন থেকে তিনটি কোচে প্রায় ১২৫ জন সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথজুড়ে ছিল হাসি-আড্ডা, গল্প আর আনন্দের উচ্ছ্বাস। ব্যস্ত মোটরওয়ে পেরিয়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার সফর শেষে আমরা পৌঁছে যাই দক্ষিণ ইংল্যান্ডের মনোরম সমুদ্র উপকূলীয় শহর হেস্টিংসে।
হেস্টিংসে পৌঁছেই প্রথমে তোলা হয় স্মরণীয় গ্রুপ ছবি। এরপর পরিবেশন করা হয় প্যাকেট লাঞ্চ। দুপুরের খাবারের পর ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সবাই নিজেদের মতো করে সমুদ্রসৈকত উপভোগ করবেন এবং বিকেল সাড়ে তিনটায় সবাই নির্ধারিত মিলনস্থলে ফিরে আসবেন।
তারপর যেন পুরো সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের উৎসব। কেউ সমুদ্রের শীতল পানিতে নেমে গ্রীষ্মের উষ্ণতা ভুলে যান, কেউ পরিবারের সঙ্গে সৈকতের পাথুরে তীরে হাঁটতে হাঁটতে উপভোগ করেন নীল সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য। শিশুদের হাসি, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর প্রবীণদের গল্পে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সৈকত।
ইতিহাসের সাক্ষী হেস্টিংস
হেস্টিংস শুধু একটি জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত নয় ,এটি ব্রিটিশ ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১০৬৬ সালের বিখ্যাত ব্যাটল অব হেস্টিংস-এর মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম, যিনি পরে 'উইলিয়াম দ্য কনকারার' নামে পরিচিত হন, এই যুদ্ধে ইংল্যান্ডের রাজা হ্যারল্ড দ্বিতীয়কে পরাজিত করেন। সেই বিজয়ের প্রভাব ইংল্যান্ডের রাজনীতি, প্রশাসন, আইন, ভাষা এবং সংস্কৃতিতে আজও বিদ্যমান।
হেস্টিংসের পুরোনো শহর, ঐতিহাসিক দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, সরু পাথুরে রাস্তা এবং ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার নৌকাগুলো অতীতের সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে আধুনিক পর্যটন সুবিধা, সমুদ্রতীরের মনোরম পরিবেশ এবং প্রাণচঞ্চল আবহ এই শহরকে ব্রিটেনের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করেছে।
আনন্দে ভরা বিকেল
নির্ধারিত সময়ে সবাই আবার মিলিত হলে শুরু হয় বিভিন্ন আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। শিশুদের খেলাধুলা, বড়দের অংশগ্রহণ আর সবার উচ্ছ্বাসে পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তাইসির মাহমুদ ,ভাইস প্রেসিডেন্ট আহাদ চৌধুরী বাবু ,ট্রেজারার আব্দুল হান্নান, ইভেন্ট এন্ড ফ্যাসিলিটিজ সেক্রেটারি রুপি আমিন ট্রেনিং সেক্রেটারি আলাউর রহমান খান শাহীন সহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, এমন আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এটি সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে এবং প্রবাসে একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতাকে শক্তিশালী করে।
শুধু ভ্রমণ নয়, সম্পর্কের বন্ধন
লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বার্ষিক সামার ট্রিপ সেই ধারাবাহিকতারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারও অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। ফলে এই আয়োজন পরিণত হয় এক বড় পারিবারিক মিলনমেলায়।
দিনের শেষে সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে, তখন ফিরে যাওয়ার সময়ও এসে যায়। সবাই আবার তিনটি কোচে উঠে লন্ডনের পথে যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গে নিয়ে যান সমুদ্রের গর্জন, ইতিহাসের স্পর্শ, পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় সময় এবং সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা অসংখ্য স্মৃতি।
হেস্টিংসে কাটানো এই একটি দিন হয়তো ক্যালেন্ডারের হিসেবে খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু যারা এই সফরের অংশ ছিলেন, তাদের কাছে এটি হয়ে থাকবে হাসি, সম্প্রীতি, ইতিহাস আর ভালোবাসায় ভরা এক অনন্য স্মৃতির নাম।







