বাংলাদেশ ২৮ জুন ২০২৬

জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড কে, সংসদে দুই দফায় বিতর্ক

post

টিভি নাইনটিন নিউজ ডেস্ক ( অনলাইন )ঢাকাঃ  ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা মূল নেতৃত্ব কার এ প্রশ্নে জাতীয় সংসদে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। বাজেট অধিবেশনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা এ বিষয়ে দুই দফায় মুখোমুখি অবস্থান নেন।সরকারি দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জুলাই আন্দোলনের একক কোনো মাস্টারমাইন্ড নেই; এর প্রকৃত কৃতিত্ব বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ ও বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের। রোববার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা অতীতে নিজেই মন্তব্য করেছিলেন যে, জুলাই আন্দোলনের প্রধান নায়ক ছিলেন তারেক রহমান। দূরে অবস্থান করেও তারেক রহমান আন্দোলনকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গণঅভ্যুত্থানকে বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছেন।এই বক্তব্যের পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তার বক্তব্যের সময়কাল ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতা ভিন্ন ছিল এবং তখন যাঁরা মাঠে থেকে আন্দোলনকে সফল করেছেন, তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ড. ইউনূস যখন অনেককে নিয়ে আমেরিকায় গিয়েছিলেন, সেখানে একজন ব্যক্তিকে তিনি মাস্টারমাইন্ড বলেছিলেন। আমি প্রথম প্রতিবাদ করে বলেছিলাম যে, এই অভ্যুত্থানের একক কোনো মাস্টারমাইন্ড আমরা কোনো ব্যক্তিকে মানি না। এটাই ফ্যাক্ট। আগেও বলেছি, এখনও বলছি, বলতেই থাকব।পরে সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বিষয়টি আবারও সংসদে তোলেন। তিনি বলেন, অতীতে বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে জুলাই বিপ্লবের মহানায়ক ও প্রধান নায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাই প্রতিমন্ত্রী মিল্লাতের বক্তব্য তথ্যভিত্তিক বলেই তিনি দাবি করেন এবং তা সংসদের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি বক্তব্যটি দিয়েছিলেন বিএনপির একটি ইফতার অনুষ্ঠানে, ১২ দলীয় কোনো সভায় নয়। তিনি স্বীকার করেন, ওই সময় তারেক রহমানের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা নেতৃত্বের নয়; এটি ছিল জনগণের সম্মিলিত আন্দোলন।রোববার সংসদ অধিবেশনে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কার, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলেও সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় জুলাই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বিতর্ক।

আদ্-দ্বীন নিয়ে জামায়াতকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, হাসপাতালটিতে ‘অক্সিজেনের অভাব ও অবহেলার কারণে’ নবজাতকদের মৃত্যু হয়েছে; তাই হাসপাতালগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। রোববার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আজকে অনেক সংসদ সদস্য আদ্-দ্বীন নিয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন, ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় তারা ডায়ালাইসিস করায়। সত্য। মাথাব্যথায় কি মাথা কেটে ফেলা যায়? না, কাটা যায় না। তবে যারা মাথা কাটে, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে না কি? অস্বীকার করবেন? করতে পারেন না। আনতে হবে।সংসদে ইউনাইটেড হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে আগুনের ঘটনার সঙ্গে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার তুলনার জবাবও দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, উনারা কোভিড টাইমে ইউনাইটেড হসপিটালে আগুন লেগে ছয়জন মারা গেছে, তখন তো ইউনাইটেডের লাইসেন্স সরকার বন্ধ করেনি, এটা বলেছেন। বার্ন ইউনিটের আগুনের কথা বলেছেন। আমি তাদের সঙ্গে একমত। ইউনাইটেড এবং বার্ন ইউনিটের ঘটনা ছিল দুর্ঘটনা, বিদ্যুতের কারণে। কিন্তু আদ্-দ্বীনে যে ঘটনা ঘটেছে, আপনারা কেউ যাননি। আজকে সংসদে কথা বলেন। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাখাওয়াত বলেন, শিশুরা যখন বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, তখন ওয়ার্ডে অক্সিজেন ছিল না। ছয়টা শিশু যখন হাত-পা বাইরে বের করে বাঁচার জন্য কাঁদতেছিল, সেই হাইপারক্যাপনিয়ায়, এসি বন্ধ করে দিয়েছে, ঘরে জানালা নেই, কাচ বন্ধ, কোনো অক্সিজেন নেই। ওয়ার্ডে থাকা মায়েদের অবস্থার কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ১৬-১৭ জন মানুষ, মায়েরা কাঁদতেছে, ছোটাছুটি করতেছে; একজন ডাক্তার আসেনি। সেই বাচ্চাগুলি ছটফট করতে করতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের জন্য তারা মৃত্যুর কোলে পড়েছে। হাসপাতালের মালিক ঘটনাস্থলে যাননি বলেও অভিযোগ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, মালিক দেখতে পর্যন্ত যাননি। কিন্তু ঘটনার পরের দিন আমি গিয়েছি। আমি দুইজন ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। তারা একমত হয়েছেন, এটা অবহেলার কারণে, অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চাগুলি মারা গেছে।

‘ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার’ সংস্কার চায় বিরোধী দল

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে বিরোধী দল সংসদে কথা বলে না দাবি করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, তারা শুধু ‘ক্ষমতার ভাগ’ পাওয়ার সংস্কার নিয়ে কথা বলে। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেছেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে সংসদে আলোচনা হলে তিনি খুশি হতেন। মুহিত বলেন, আমাদের বিরোধী দল মাঝে মাঝেই সংস্কারের কথা বলেন। জুলাই সনদের কথা বলেন। ওনারা শুধু সেই সংস্কারের কথা বলেন, যেই সংস্কার ওনাদেরকে ক্ষমতার ভাগ দেবে। ওনারা স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার নিয়ে একদিনও আজ পর্যন্ত কথা বলেননি। তিনি বলেন, একটি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন হয়েছিল। তারা অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করে অনেক কিছু লিখে দিয়েছে। আমি খুশি হতাম, আমাদের বিরোধী দল যদি সেই স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে আমাদের এখানে কথা বলত।

জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালুর দাবি জামায়াত এমপির

দেশে সুদভিত্তিক অর্থনীতির বদলে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু করার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশে সুদ ছাড়াই অর্থনীতি চলতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি বাংলাদেশে চালু করতে হবে। সুদভিত্তিক অর্থনীতির কবর রচনা করতে হবে।’ বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুজিবুর রহমান বিভিন্ন মাজহাবের আলেমদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করা এবং জাকাত মন্ত্রণালয় গঠন করারও প্রস্তাব দেন। সংসদ সদস্য দাবি করেন, বাংলাদেশেও সুদ বন্ধ করে ইসলামী অর্থনীতি চালু করার একটা চেষ্টা ইসলামী ব্যাংক করেছিল। কিন্তু ‘শকুনের দৃষ্টি’ ইসলামী ব্যাংকের ওপর পড়ার কারণে এই ব্যাংক বিধ্বস্ত হতে চলেছে।পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন আয়াত উল্লেখ করে ঋণ ও সুদের কুফলের কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, আল্লাহ–তায়ালা সুদকে ধ্বংস করেন এবং জাকাত ও সাদকাকে বৃদ্ধি করেন।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়ায় সুদ বন্ধ করে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু করার একটা প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি করার, সুদ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হলো ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও পাকিস্তান। মুজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক যখন ঠিকমতো চলছিল, তখন বড় বড় সুদি ব্যাংক বাংলাদেশে ছিল। তারা যখন দেখল, এই সুদির কারবার চলছে না, তখন প্রতিটা ব্যাংক তারা ইসলামিক কাউন্টার খুলেছিল। এটা প্রমাণ করে বাংলাদেশে সুদ ছাড়াই অর্থনীতে চলতে পারে।’

৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব

সরকারকে বর্তমানে প্রচলিত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি দাবি করেন, এতে ঘরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরবে, ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়বে এবং কালো টাকার প্রবাহ কমানো সম্ভব হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেকে ব্যাংকে না রেখে ঘরে নগদ অর্থ সংরক্ষণ করছেন। আবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার যদি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়ার সুযোগ দেয়, তাহলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে।ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন প্রস্তাব করেন, যাদের ওই অর্থের বৈধ উৎস কর নথিতে নেই, তারা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কর পরিশোধ করে অর্থ বৈধ করার সুযোগ পেতে পারেন। এতে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি, ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাতে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরো পড়ুন!

Sidebar Banner
Sidebar Banner