শিল্পন গরী খুলনা থেকে ঢাকা ফেরার গল্প শুনতে সাধারণ একটি ভ্রমণ কাহিনী মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি হয়ে উঠলো অব্যবস্থাপনা আর চরম ভোগান্তির এক নির্মম অভিজ্ঞতা।
তিনদিন আগে অনলাইনে টিকিট কাটা হলো, কিন্তু কেবিন পাওয়া গেল না।বাধ্য হয়ে উঠতে হলো এসি বগিতে।আমার ভ্রমণ সঙ্গী আবু সুফিয়ান ঝিলাম।ট্রেনের বগিতে পা দিতেই আমাদের চোখে পড়লো এসি বগিতে ‘এসি’ নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে নোংরা, অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার এক জঘন্য চিত্র।
প্রতিটি সিটের কভার দেখে বুঝা গেলো,এগুলো কোনোদিন ধোয়া হয়নি।তেল চিটচিটে, ধুলো,বালি,ময়লা,ছারপোকা আর দুর্গন্ধে ভরা।ঐ পরিবেশে বসে থাকা মানে নিজের রুচির সাথে আপস করা।খুলনা থেকে ঢাকা মাত্র ৪/৫ ঘণ্টার যাত্রা।তবুও শরীর ঘিনঘিন করতে লাগলো।নিজের কাছে প্রশ্ন করলাম যেখানে যাত্রীদের কাছ থেকে এসি ভাড়া নেওয়া হয়, সেখানে ন্যূনতম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা কি এতই কঠিন ?
অভিযোগ জানাতে ট্রেন ইনচার্জকে ডাকা হলো।কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া আরও হতাশাজনক।অভিযোগ শুনে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, তার ভাবখানা এমন যে কেবিন না পাওয়ার কারণেই আমার এই ক্ষোভ ! অথচ প্রশ্ন ছিল সরল,সিট কভার পরিষ্কারের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ হয়, সেটি কোথায় যায় ? কার পকেটে ঢুকে এই টাকা ?#
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো তার সেই বক্তব্য।“আমাদের কিছুই করার নেই, স্যার।সব উপর মহলের নির্দেশ।” এই একটি বাক্যই পুরো ব্যবস্থার চিত্র স্পষ্ট করে দিলো ।দায়িত্বহীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং দুর্নীতির এক অদৃশ্য চক্র যেন পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে পঙ্গু করে রেখেছে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, খুলনার মতো একটি বিভাগীয় শহর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সরাসরি ট্রেন সারাদিনে মাত্র একটি।তাও আবার কাকডাকা ভোরে।এটা কি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য ?
২০২০ সালে সিলেটে আলতাব আলীকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারির কাজ শেষ করে, আমি সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে নতুন একটি প্রামাণ্যচিত্রের লোকেশন খুঁজতে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।কিন্তু সিলেট থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করা যেন একপ্রকার অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।বহু চেষ্টা করেও যখন টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না, তখন শেষ পর্যন্ত সিলেট প্রেস ক্লাবের সহায়তা নিতে হয়েছিল একটি সাধারণ টিকিট পাওয়ার জন্য।
এই অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রেনযাত্রীর সংখ্যা কতটা বেশি।প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করছে।এমন বাস্তবতায় ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেবার পরিসর সম্প্রসারণ সময়ের অপরিহার্য দাবি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যাত্রীসংখ্যা,ট্রেনের চাহিদা ও ট্রেন টিকেটের দাম বাড়লেও সেবার মান এবং পরিধি যেন একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে।যা দেখার কেউ নেই।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো,এত যাত্রী থাকা সত্ত্বেও প্রতিবছর বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসান প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ! এটা কি শুধুই অদক্ষতার ফল, নাকি এর পেছনে আছে গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির শেকড় ?
সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের নানা গান শোনা যায়।কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে।বিপুল পরিমান চাহিদা থাকতেও যদি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান গুনে, সেবার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হয়, এবং জনগণকে ন্যূনতম সম্মানজনক সেবা দিতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার মতো যোগ্য লোক কি আদৌ দেশে নেই ?
এই পরিস্থিতিতে কঠিন হলেও একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে। যদি অভ্যন্তরীণভাবে দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে কি বিকল্প কোনো মডেল বা বিদেশী কোনো কোম্পানির কথা ভাবার সময় এখনো আসেনি ?
বাংলাদেশ রেলওয়ে কি জনগণের জন্য, নাকি কিছু সুবিধাভোগীর জন্য ? আজ হোক আর দুদিন পরেই হোক এই প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একদিন দিতেই হবে। ( চলবে )
লন্ডন : ২৪.০৪.২০২৬.
সিনিয়র সাংবাদিক কলামিস্ট ও প্রবাসী লেখক শেখ মহিতুর রহমান বাবলুর ভেরিফায়েড ফেইসবুক থেকে সংগৃহিত।








