ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট বিস্তৃতি প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদী ও জলাভূমি অঞ্চল—যেখানে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রচলিত কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা কঠিন।
গত ৬ মার্চ প্রকাশিত ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা The Hindu-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই দুর্গম ও জলাভূমি এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদারের বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবছে ভারত সরকার। বিশেষ করে, যেসব স্থানে সার্বক্ষণিক মানব পাহারা বা অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, সেখানে কুমির ও সাপের মতো সরীসৃপ ব্যবহার করা যায় কি না—এমন একটি ধারণা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এই ভাবনাটি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর উদ্যোগে উঠে এসেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং বিষয়টি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কি না তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।......................
যে কোনো বিবেচনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের নামে কুমির ও সাপ—ছাড়ার চিন্তা নিছক অবান্তরই নয়, বরং গভীরভাবে অমানবিক, বিপজ্জনক এবং সভ্য রাষ্ট্রচিন্তার পরিপন্থী। এমন প্রস্তাব কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না, বরং এটি মধ্যযুগীয় বর্বরতার স্মৃতি উসকে দেয়।কারণ !
প্রথমত : সীমান্ত নিরাপত্তা একটি জটিল, সংবেদনশীল এবং মানবকেন্দ্রিক বিষয়। এখানে প্রযুক্তি, কূটনীতি, মানবাধিকার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। সেখানে জীবন্ত প্রাণীকে “প্রহরী” হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা শুধু অযৌক্তিকই নয়, সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। কুমির বা সাপ কোনোভাবেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, তারা নির্বিচারে আক্রমণ করতে পারে—যার শিকার হবেন সীমান্তবর্তী নিরীহ গ্রামবাসী, জেলে, কৃষক কিংবা শিশুরা।
দ্বিতীয়ত : এই প্রস্তাব মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। সীমান্তে বসবাসকারী মানুষরা কোনো শত্রু নয়, তারা রাষ্ট্রের নাগরিক বা প্রতিবেশী দেশের সাধারণ মানুষ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। এমন নীতি বাস্তবায়িত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়বে এবং আঞ্চলিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তৃতীয়ত : পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও এই চিন্তা মারাত্মক ক্ষতিকর। কৃত্রিমভাবে সরীসৃপ ছেড়ে দেওয়া মানে একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপ, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলাফল অনির্দেশ্য এবং সম্ভাব্যভাবে বিপর্যয়কর।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এ ধরনের প্রস্তাব রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী স্তরে কীভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। সীমান্ত সুরক্ষার জন্য উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি, ড্রোন, সেন্সর, সমন্বিত টহলব্যবস্থা—এসব আধুনিক পদ্ধতি যখন বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সরীসৃপ ছাড়ার মতো চিন্তা কেবল পশ্চাৎপদ মানসিকতারই পরিচয় দেয়।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উচিত মানবিকতা, যুক্তি ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভয় এবং অমানবিক কৌশলের ওপর নির্ভর করে কোনো টেকসই নিরাপত্তা গড়ে তোলা যায় না। বরং এতে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।
অতএব, এই প্রস্তাব অবিলম্বে প্রত্যাহার করে সীমান্ত নিরাপত্তায় বাস্তবসম্মত, মানবিক ও আধুনিক পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হওয়াই সময়ের দাবি।ভারত সরকারকে মনে রাখতে হবে এমনিতেই সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভ তীব্র, এর মধ্যে সীমান্তে সাপ ও কুমির অবমুক্তির মতো চিন্তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করবে।সুতরাং এই ধারণা শুধু অমানবিকই নয়, বরং একটি লজ্জাজনক নীতিগত বিচ্যুতি হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।
প্রবাসী লেখক গবেষক কলামিস্ট ও সাংবাদিক শেখ মহিতুর রহমান বাবলুর ভেরীফায়েড ফেসবুক থেকে সংগৃহিত







